COVID-19 এ (হোম) কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন সম্পর্কে

 

কোয়ারেন্টাইন অর্থ- একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথক থাকা। তবে কোয়ারেন্টাইন মানে এই নয় যে, আপনাকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়া হলো। যদি কারো করোনা ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে তাকে জনবহুল এলাকা থেকে দূরে রাখতে এবং ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে অন্তত ১৪ দিন আলাদা থাকতে বলা হয়।

মূলত কভিড-১৯ কোয়ারেন্টাইন মানে বাড়িতে বা বদ্ধ ঘরে থেকে অথবা সম্পূর্ণ নিরাপদ স্থানে থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

কোয়ারেন্টাইনে সর্বোচ্চ চার থেকে ছয়জনকে একসঙ্গে রাখা যায়। এর বেশি হলে সেটা আর কোয়ারেন্টাইন নয়। আলাদা করে সবাইকে রাখা হচ্ছে। অবজারভেশনে রাখা না হলে এ রোগ আরো ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বিশ্ব যেসব দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সেসব দেশের মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হচ্ছে। শুধু ইতালিতেই কোয়ারেন্টাইনে ১ কোটি ১৬ লাখ মানুষকে রাখা হয়েছে।

তবে কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানে আপনার ফোন নিয়ে যাওয়া হবে না। এমনকি প্রতিনিয়ত ব্যবহার্য অন্যসব জিনিসপত্রও কেড়ে নেওয়া হবে না।

করোনার উপস্থিতি ১৪ দিনের মধ্যে আক্রান্তের শরীরে পাওয়া যায়। যার জন্য এই ১৪ দিনে উপসর্গ পাওয়া রোগীর সংক্রমণ বাড়ে কিনা তা নিরীক্ষণ করা হয়। করোনারভাইরাসগুলো ধীরে ধীরে সুস্থ কোষের সঙ্গে মেশে। আর এই সময়ের মধ্যে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে নিয়মিত সময়ে শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা ও জ্বর কমাতে ওষুধ গ্রহণসহ ভালো স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন করানো হয়।

করোনা আক্রান্ত রোগীদের ব্যবহার করা টাওয়াল, খাবারের পাত্র ও অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় ব্যবহৃত জিনিসগুলো দিয়েও ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর জন্যই কোয়ারেন্টাইনে উপসর্গ পাওয়া মানুষদের রাখা হয়।

এদিকে করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এর মধ্যে হাত না ধুয়ে নিজের চোখ, মুখ ও নাক স্পর্শ না করা। আর প্রতিদিন কয়েকবার সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড হাত ধুতে হবে।

এবার জেনে নিন হোম কোয়ারেন্টাইন কি ও কিভাবে থাকতে হয় সেখানে:

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১৪ জন আক্রান্ত ও ১ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে, জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। বিদেশ ফেরতদের থেকে দেশে এ ভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছে। তাই আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বারবার বিদেশ ফেরতদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশনা দিচ্ছে।

হোম কোয়ারেন্টাইন সম্পর্কে দেশের বেশিরভাগ মানুষ অবগত নয়। কারও কারও ধারণা ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’ মানে ঘরের ভেতরে থাকলেই হয়। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যাক্তিকে কিভাবে থাকতে/রাখতে হবে সে ব্যাপারে নিম্নোক্ত পরামর্শগুলো মানতে বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

  • বাড়ির অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা থাকুন। সম্ভব না হলে, অন্যদের থেকে অন্তত ১ মিটার (৩ ফুট) দূরে থাকুন, ঘুমানোর জন্য পৃথক বিছানা ব্যবহার করুন।
  • আলো বাতাসের সুব্যবস্থা সম্পন্ন আলাদা ঘরে থাকুন এবং অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা থাকুন।
  • সম্ভব হলে আলাদা গোসলখানা এবং টয়লেট ব্যবহার করুন। সম্ভব না হলে, অন্যদের সাথে ব্যবহার করতে হয় এমন স্থানের সংখ্যা কমান ও ওই স্থানগুলোতে জানালা খুলে রেখে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করুন।
  • বুকের দুধ খাওয়ান এমন মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াবেন। শিশুর কাছে যাওয়ার সময় মাস্ক ব্যবহার করুন এবং ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
  • আপনার সঙ্গে কোনো পশু-পাখি রাখবেন না।
  • বাড়ির অন্য সদস্যদের সঙ্গে একই ঘরে অবস্থান করলে, বিশেষ করে এক মিটারের মধ্যে আসার সময় মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।
  • প্রয়োজনে বাড়ি থেকে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করুন।
  • মাস্ক পরে থাকাকালীন এটি হাত দিয়ে ধরা থেকে বিরত থাকুন। মাস্ক ব্যবহারের সময় প্রদাহের (সর্দি, থুতু, কাশি, বমি ইত্যাদি) সংস্পর্শে আসলে সঙ্গে সঙ্গে মাস্ক খুলে ফেলুন এবং নতুন মাস্ক ব্যবহার করুন। মাস্ক ব্যবহারের পর ঢাকনাযুক্ত ময়লার পাত্রে ফেলুন এবং সাবান পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।
  • টিস্যু পেপার ও মেডিকেল মাস্ক ব্যবহারের পর ঢাকনাযুক্ত বিনে ফেলুন।
  • ব্যক্তিগত ব্যবহার সামগ্রী অন্য কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করবেন না।
  • আপনার খাওয়ার বাসনপত্র- থালা, গ্লাস, কাপ ইত্যাদি, তোয়ালে, বিছানার চাদর অন্য কারও সাথে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করবেন না। এসব জিনিসপত্র ব্যবহারের পর সাবান-পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে ফেলুন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আপনার কোয়ারেন্টাইন শেষ হবে। চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত মতে একজন হতে অন্যজনের কোয়ারেন্টাইনের সময়সীমা আলাদা হতে পারে। তবে, এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এ সময়সীমা ১৪ দিন। কোয়ারেন্টাইনেকালে সকলের সাথে ফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেটের সাহায্যে যোগাযোগ রাখুন।
  • শিশুকে তার জন্য প্রযোজ্যভাবে বোঝান। তাদের পর্যাপ্ত খেলার সামগ্রী দিন এবং খেলনাগুলো খেলার পরে জীবাণুমুক্ত করুন।
  • আপনার দৈনন্দিন রুটিন, যেমন- খাওয়া, হালকা ব্যায়াম ইত্যাদি মেনে চলুন।
  • সম্ভব হলে বাসা থেকে অফিসের কাজ করুন।
  • বইপড়া, গান শোনা, সিনেমা দেখা অথবা উপযুক্ত নিয়মগুলোর সাথে পরিপন্থী নয় এমন যেকোনো বিনোদনমূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করুন বা ব্যস্ত রাখুন।
  • পরিবারের সদস্য যারা সুস্থ আছেন এবং যাদের দীর্ঘমেয়াদী রোগসমূহ (যেমন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যানসার, অ্যাজমা প্রভৃতি) নেই, এমন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে পরিচর্যাকারী হিসেবে নিয়োজিত হতে পারেন। তিনি ঐ ঘরে বা পাশের ঘরে থাকবেন, অবস্থান বদল করবেন না। কোয়ারেন্টাইনে আছেন এমন ব্যক্তির সাথে কোনো অতিথিকে দেখা করতে দিবেন না।
  • পরিচর্যাকারী খালি হাতে ওই ঘরের কোনো কিছু স্পর্শ করবেন না। কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে বাতাস ঘরে ঢুকলে; খাবার তৈরির আগে ও পরে; খাবার আগে; টয়লেট ব্যবহারের পরে; গ্লাভস পরার আগে ও খোলার পরে; যখনই হাত দেখে নোংরা মনে হলে করার পর প্রতিবার দুই হাত পরিষ্কার করবেন।
  • কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তির ব্যবহৃত বা তার পরিচর্যায় ব্যবহৃত মাস্ক, গ্লাভস, টিস্যু ইত্যাদি অথবা অন্য আবর্জনা ঐ রুমে রাখা ঢাকনাযুক্ত ময়লার পাত্রে রাখুন। এসব আবর্জনা উন্মুক্ত স্থানে না ফেলে পুড়িয়ে ফেলুন। ঘরের মেঝে, আসবাবপত্রের সকল পৃষ্ঠতল, টয়লেট ও বাথরুম প্রতিদিন অন্তত একবার পরিষ্কার করুন। পরিষ্কারের জন্য ১ লিটার পানির মধ্যে ২০ গ্রাম (২ টেবিল চামচ পরিমাণ), ব্লিচিং পাউডার মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করুন। ঐ দ্রবণ দিয়ে উক্ত সকল স্থান ভালোভাবে মুছে ফেলুন। তৈরিকৃত দ্রবণ সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে।
  • কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিকে নিজের কাপড়, বিছানার চাদর, তোয়ালে ইত্যাদি ব্যবহৃত কাপড় গুঁড়া সাবান-কাপড় কাচা সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে বলুন এবং ভালোভাবে শুকিয়ে ফেলুন।
  • নোংরা কাপড় একটি লন্ড্রি ব্যাগে আলাদা রাখুন। মল-মূত্র বা নোংরা লাগা কাপড় ঝাঁকাবেন না এবং নিজের শরীর বা কাপড়ে যেন না লাগে তা খেয়াল করুন।
  • কোয়ারেন্টাইনে থাকার সময় কোনো উপসর্গ দেখা দিলে (১০০ ফারেনহাইট, ৩৮ সেলসিয়াস এর বেশি, কাশি, সর্দি, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি) অতি দ্রুত আইইডিসিআর-এর হটলাইন নম্বরে অবশ্যই যোগাযোগ করুন এবং পরবর্তী করণীয় জেনে নিন।

আইইডিসিআর-এর হটলাইনের নম্বর: ০১৫৫০০৬৪৯০১-৫, ০১৪০১১৮৪৫৫১, ০১৪০১১৮৪৫৫৪, ০১৪০১১৮৪৫৫৫, ০১৪০১১৮৪৫৫৬, ০১৪০১১৮৪৫৫৯, ০১৪০১১৮৪৫৬০, ০১৪০১১৮৪৫৬৩, ০১৪০১১৮৪৫৬৮, ০১৯২৭৭১১৭৮৪, ০১৯২৭৭১১৭৮৫, ০১৯৩৭০০০০১১, ০১৯৩৭১১০০১১।

আইসোলেশন কি?

করোনা মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালে তৈরি হচ্ছে আইসোলেশন ওয়ার্ড। করোনা মোকাবিলায় ভরসা বিশেষভাবে তৈরি এই ওয়ার্ড। কীভাবে আইসোলেশন ওয়ার্ড তৈরি হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশিকা দিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। কী আছে সেই নির্দেশিকায় ? করোনার চিকিৎসায় কীভাবে তৈরি হবে আইসোলেশন ওয়ার্ড? বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন,

  • ০১. আইসোলেশন ওয়ার্ডের সামনে অ্যান্টি চেম্বার থাকতে হবে।।
  • ০২. এখানেই পোশাক বদল করে ওয়ার্ডে ঢুকবেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।
  • ০৩. অ্যাপ্রন, জুতো, মাক্স পরে ঢুকতে হবে। প্রয়োজনে চশমা ব্যবহার করতে হবে।
  • ০৪. দুটি বেডের মধ্যে এক মিটার দুরত্ব থাকতেই হবে।
  • ০৫. ওয়ার্ডের ভিতরের হাওয়া সরাসরি বাইরে যাওয়া চলবে না।
  • ০৬. হাওয়া বের করতে হেপাফিল্টার থাকতে হবে।
  • ০৭. দূষিত হাওয়া পরিশুদ্ধ করে বের করতে পারে হেপাফিল্টার।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, আইসোলেশন ওয়ার্ড পিছু একজন রোগী থাকাটাই সবচেয়ে ভাল। ভারতের মতো দেশে সেটা সম্ভব না হলে? আইসোলেশন ওয়ার্ড নিয়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *